বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩

আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ অনন্ত গ্রুপের বিরুদ্ধে

অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে প্রায় ১০৩ কোটি ৬৯ লাখ ৬৬ হাজার ৩২৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য বিদেশে রফতানি না করে খোলা বাজারে বিক্রি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহির, যিনি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য। তার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে।
পানামা পেপার্সে নাম
২০১৬ সালে ফাঁস হওয়া পানামা পেপাসের নথিতে শরীফ জহিরের নাম আসে, যা বিদেশে অফশোর কোম্পানি স্থাপন ও অর্থপাচারের সন্দেহ উত্থাপন করে। পানামা পেপার্সে নাম আসা বাংলাদেশিদের নিয়ে কয়েক বছর আগে থেকেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা অনুসন্ধান ও তদন্ত চালিয়ে আসছিল। বিষয়টি তখন ব্যাপক আলোচিত হলে উচ্চ আদালত থেকে তাদের তালিকা চাওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। পরে ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি পানামা ও প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারিতে নাম আসা ৬৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা হাইকোটের (উচ্চ আদালত) একটি বেঞ্চে দাখিল করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে পানামা পেপার্সে ৪৩ ও প্যারাডাইস পেপার্সে ২৬ জনের নাম রয়েছে। সেই তালিকাতেও এই শরীফ জহিরের নাম রয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও অর্থপাচার
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শরীফ জহিরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে দুদক অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহযোগিতা চেয়েছে।
জমি দখলের অভিযোগ
আক্তার হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, শরীফ জহির ও তার সহযোগিরা তার জমি অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ের তিনি ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
গত ২০ এপ্রিল ভাটারা থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে আক্তার হোসেন উল্লেখ্য করেছেন, অনন্ত রিয়েল এস্টেট লিমিটেড কোম্পানির নামে শরীফ জহির, ওমর মবিন, তামান্না রাব্বানী ওর্ রজানন্দ সরকার পরস্পর যোগসাজশে তার ক্ষতি ও হয়রানি করার নানা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। যে সম্পত্তিতে তার কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে কাজ করতে গেলে তাকে (আক্তার হোসেন) প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। যে কারণে তিনি পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শ্রমিকদের নির্যাতন
সংশ্লিষ্টরা জানান, জোরপূর্বক অন্যের জমি দখল, পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঠিক সময়ে বেতন না দেওয়া ও নির্যাতনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহিরের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে আদমজী ইপিজেডে অনন্ত গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের নির্যাতন ও ছাটাইয়ের অভিযোগে সেখানকার শত শত শ্রমিক মানববন্ধনও করেছেন। সে সময় ওই পোশাক কারখানার প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিককে পুলিশ দিয়ে নির্যাতন করানো হয়। এছাড়া বকেয়া পরিশোধ না করেই অনন্ত দেড়শ শ্রমিককে ছাটাই করা হয়।
শুল্ককর ফাঁকি ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার
অনন্ত গ্রুপের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে প্রায় ১০৩ কোটি ৬৯ লাখ ৬৬ হাজার ৩২৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে অনন্ত গ্রুপ। তবে এ ধরনের কোনও অভিযোগ বা তথ্য এনবিআরের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোডের (এনবিআর) সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন। মঙ্গলবার (৪ ফেব্রুয়ারি) তিনি বলেন, ‘অনন্ত ডেনিম টেকনোলজির বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির তথ্য আমি পাইনি। এ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট খুঁজে তিনি পাননি বলেও জানান। তবে শরীফ জহিরের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)
শরীফ জহির ও তার ভাই ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিমিটেডের (এনএফএল) চেয়ারম্যান আসিফ জহিরের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার মা কামরুন নাহারের ব্যাংক হিসাব স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, কর ফাঁকি সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। গত ৩ ডিসেম্বর এনবিআর থেকে ব্যাংকগুলোকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়ে অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে বলেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আয়কর আইন ২০২৩-এর ২২৩ ধারার ক্ষমতাবলে শরীফ জহির, তার ভাই আসিফ জহির ও তাদের মা কামরুন নাহার এবং সৈয়দ ইশতিয়াক ইসলাম (পিতা- সৈয়দ দিদারুল আলম) ও তাদের পরিবারের (পিতা, মাতা, ভাই, বোন, স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা) নামে পরিচালিত সব হিসাব (ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, ভল্ট লকার) অর্থসম্পদ লেনদেন স্থগিত করতে বলা হয়েছে।

শরীফ জহির ইউসিবি ব্যাংকের নবগঠিত বোডের চেয়ারম্যান। তিনি পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার ভাই আসিফ জহির সম্প্রতি এনএফএলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি অনন্ত গ্রুপে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া, তিনি আসিফ জহির সিন্দাবাদডটকম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও এমডি।

জানা গেছে, অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শরীফ জহিরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে ২০২৪ সালের মে মাসে দুদক অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এ বিষয়ে সহযোগিতা চায়। অনন্ত গ্রুপের শরীফ জহিরের অর্থপাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধানের স্বার্থে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে গত বছরের ৭ মে চিঠি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের মানিলন্ডারিং বিভাগের পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরও বলা হয়, শরীফ জহিরের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, বিদেশে অফশোর কোম্পানি খুলে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর ফাঁকি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।

আদালতের নির্দেশ অমান্য
তার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তার প্রতিষ্ঠিত অনন্ত টেরেসেস কোম্পানির মাধ্যমে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দেওয়ানী মামলা নং ৯৬৭/২০২৩। গত ১৯-১-২০২৫ যার আদেশ হয় ১ ও ২ বিধি মতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনা করেন। নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় বাদী পক্ষ ইতিপূর্বে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনায় বিগত ২১/০১/২০২৪ ইং তারিখের দরখাস্থ দাখিল করেন ।
উক্ত দরখাস্থটি শুনানী অন্তে ১০ দিনের কারন দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। অত্র কারন দর্শানোর নোটিশ রীতিমত জারী অন্তে ফেরত আসে। পড়ে ৪-৭ নং বিবাদী পক্ষ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্তের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি দাখিল করেন। পরবর্তীতে বাদীপক্ষ অদ্য দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ এর ১৫১ ধারার দরখাস্থ দ্বারা দরখাস্থে উল্লেখিত তফসিল বর্ণিত ভূমিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনা করেন। সার্বিক বিবেচনায় বাদীপক্ষের আনীত অদ্যকার দরখাস্থের প্রার্থীতমতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মূল দরখাস্থ শুনানী না হওয়া পর্যন্ত নালিশী তফসিল বর্ণিত সম্পত্তিতে সকল প্রকার কার্যক্রম বিষয়ে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ থাকা সত্তেও তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং কাজ চালিয়ে যান এমতাবস্থায় প্রশাসনের ভুমিকা নিরব বলে দাবী ভুক্তভোগীর।
এ বিষয় বাদী আক্তার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,অনন্ত গ্রুপ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে, ক্ষমতার অপব‌্যাবহার কর,েকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আমি খুব শিগ্রই তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করবো।

দেশকাল টিভি -চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন,ধন্যবাদ।

জনপ্রিয় পোস্ট

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.deshkaltv.com কর্তৃক সংরক্ষিত